নমস্কার ও শুভেচ্ছা!
আমি আজ আপনাদের সাথে এমন এক অনুভব শেয়ার করব, যা দেশের সীমানার ভেতর থাকলে হয়তো এভাবে বলা সম্ভব হতো না। বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিকে আমি এখন এক নতুন লেন্স দিয়ে দেখতে পারছি। যখন আপনি একটি উন্নত দেশের শাসনব্যবস্থা, নাগরিকদের অধিকার এবং আইনের প্রয়োগ কাছ থেকে দেখেন, তখন নিজের দেশের রাজনীতির ক্ষতগুলো আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয়।
আজ আমি দেশের রাজনীতির সেই ব্যবচ্ছেদটিই করব।
১. ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বনাম প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি
বিদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি নয়, বরং আদর্শ এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে রাজনীতি এখনো ব্যক্তিপূজা এবং পরিবারতন্ত্রের বৃত্তে বন্দী। যদিও আমি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন গর্বিত কর্মী এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশের রূপকল্পে বিশ্বাসী, তবুও আমাকে মানতে হবে যে—তৃণমূল পর্যায়ে আজও চামচামি আর তোষামোদিই রাজনীতির মূল হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশের মাটিতে বসে যখন দেখি একজন সাধারণ নাগরিক প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করতে পারছেন, তখন ভাবি—আমাদের দেশে কি সেই রাজনৈতিক সহনশীলতা কবে আসবে?
২. ধর্ম ও রাজনীতির বিষাক্ত মিশেল
বিদেশের উন্নত দেশগুলো ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে সীমাবদ্ধ রেখেছে, কিন্তু আমাদের দেশে রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে বা জনপ্রিয়তা পেতে ধর্মের ব্যবহার এক ভয়াবহ ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। প্রগতিশীল রাজনীতির দাবিদাররাও অনেক সময় ভোট ব্যাংকের ভয়ে মৌলবাদের সাথে আপস করে। একজন মুক্তচিন্তক হিসেবে আমি মনে করি, যতদিন ধর্মকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন (Secularism) করা না যাবে, ততদিন স্মার্ট বাংলাদেশ কেবল একটি কাঠামোগত উন্নয়নই হয়ে থাকবে, বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন হবে না।
৩. পেশিশক্তি ও উন্নয়নের রাজনীতি
আমরা বড় বড় মেগা প্রজেক্ট করছি, রাস্তাঘাট উন্নত করছি—যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে পেশিশক্তি, টেন্ডারবাজি এবং দুর্নীতির যে সংস্কৃতি শিকড় গেড়েছে, তা আমাদের রাজনৈতিক অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। বিদেশের মাটিতে ট্যাক্স দেওয়া এবং তার বিপরীতে রাষ্ট্রের সেবা পাওয়া কতটা সহজ, তা না দেখলে বোঝা যেত না যে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ আইনি ও প্রশাসনিক সেবার জন্য কতটা ভোগান্তির শিকার হয়।
৪. প্রবাসীদের ভূমিকা: কেবল রেমিট্যান্স যোদ্ধা?
রাষ্ট্র আমাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে প্রশংসা করে, কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রবাসীদের কণ্ঠস্বর আজও অনুপস্থিত। বিদেশের মাটিতে বসে আমরা যখন দেখি আন্তর্জাতিক রাজনীতি কীভাবে কাজ করে, তখন দেশের পররাষ্ট্রনীতি বা রাজনৈতিক কৌশলে আমাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। রাজনীতি কেবল মিছিল-মিটিংয়ের নাম নয়, এটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার বিজ্ঞান—যা আমরা প্রবাসীরা আরও বেশি অনুভব করি।
৫. আমার রাজনৈতিক দর্শন ও প্রত্যাশা
বিদেশের মাটিতে থেকে আমি এখন আরও বেশি করে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ চাই। তবে সেই স্মার্টনেস কেবল ইন্টারনেটের গতিতে নয়, বরং বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতায়, বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তায় এবং প্রতিটি মানুষের ধর্মহীন বা ধর্মসহ জীবন যাপনের স্বাধীনতায়। আমি চাই আমার দল আওয়ামী লীগ যেন কেবল উন্নয়ন নয়, বরং আধুনিক ও মানবিক মূল্যবোধের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়।
উপসংহার
দূরত্ব অনেক সময় সত্য দেখার শক্তি বাড়িয়ে দেয়। বিদেশের মাটিতে বসে আমি দেশের রাজনীতির যে ব্যবচ্ছেদ করছি, তা ঘৃণা থেকে নয়, বরং গভীর ভালোবাসা থেকে। আমি চাই আমার দেশটা প্রকৃত অর্থেই আধুনিক হোক, যেখানে একজন মানুষ তার পরিচয় বা বিশ্বাসের কারণে নয়, বরং তার যোগ্যতার কারণে সম্মানিত হবে।
দেশকে নিয়ে আপনার রাজনৈতিক স্বপ্ন বা ক্ষোভ কী? প্রবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আপনি কী ভাবেন? নিচে মন্তব্য করুন।
মহিমা বিশ্বাস আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও মুক্তচিন্তক